SHARE
যশোরে ডিজিটাল স্কুল
যশোরে ডিজিটাল স্কুল

আধুনিক পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের অনন্য নজির স্থাপন করেছে যশোর শহরে অবস্থিত বাদশাহ ফয়সাল ইসলামি ইনস্টিটিউট। ডিজিটাল হাজিরা পদ্ধতি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, সেন্ট্রাল সাউন্ড সিস্টেম, গোটা ক্যাম্পাস সিসি ক্যামেরার আওতায়, শিক্ষকদের কার্যক্রম মনিটরিংয়ে ডিজিটাল সিস্টেম ডেভেলপমেন্টসহ স্কুলের সব কার্যক্রম পেপার লেস করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে মফস্বলের এই স্কুলটিতে। ইতিমধ্যে এই স্কুলের ডিজিটাল কার্যক্রম জেলার মধ্যে অনন্য হিসেবে জেলা প্রশাসনের স্বীকৃতি লাভ করেছে। এ স্কুলের ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে জেলার সব স্কুলে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগও গ্রহণ করেছেন জেলা প্রশাসন। ইতিমধ্যে স্কুলটি পরিপূর্ণ ডিজিটাল স্কুলের মর্যাদা লাভ করেছে।
১৯৮৫ সালে স্থানীয় উদ্যোগে যশোর উপশহর পার্ক সংলগ্ন এলাকায় এক মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গতানুগতিকভাবেই চলছিল যশোর উপশহরের বাদশাহ ফয়সাল ইসলামি ইনস্টিটিউট। বর্তমান পরিচালনা কমিটি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই বদলে যেতে থাকে স্কুলটি। বাইরের কোনো সহায়তা ছাড়াই প্রত্যেকটি শ্রেণিকক্ষসহ পুরো স্কুল ক্যাম্পাসে বসানো হয় ৩২টি সিসি ক্যামেরা। শিক্ষার্থী হাজিরার ক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে চালু করা হয়েছে ফিঙ্গার প্রিন্ট সিস্টেম। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে বসানো হয়েছে মাল্টিমিডিয়া সেট। তৈরি করা হয়েছে নিজস্ব ওয়েবসাইট। যার মাধ্যমে অনলাইনেই বেতন ও অন্যান্য ফিসহ যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি ক্লাসে রয়েছে সাউন্ড সিস্টেম; যা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে। এ সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক ক্লাস টিচার কিংবা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। আবার অবসর সময়ে দেশাত্মবোধক গানও শোনানো হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। স্কুলটিতে রয়েছে আধুনিক মানের কম্পিউটার ল্যাব ও সায়েন্স ল্যাবসহ ২৪টি শ্রেণিকক্ষ। বর্তমানে স্কুলটিতে প্রায় ১৪শ’ ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করছে। ফলে এই বিশাল শিক্ষার্থীর জন্য এ ২৪টি শ্রেণিকক্ষ যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। স্কুলের প্রধান শিক্ষক আছাহাবুল গাজী বললেন, ‘ক্যাম্পাসজুড়ে সিসি ক্যামেরা থাকায় স্কুল চত্বর ও সংলগ্ন এলাকায় ইভটিজিং পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। এমনকি শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস নিচ্ছেন কি-না, তাও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সনাতন হাজিরা পদ্ধতির বদলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মচারী সবার হাজিরা নেয়া হচ্ছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে। আবার ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও নেয়া হয় সবার ফিঙ্গার প্রিন্ট। এরফলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা বন্ধ হয়েছে। এছাড়া স্কুলটির একটি নিজস্ব ওয়েবসাইট রয়েছে, যেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে আলাদা আইডি। এই আইডি সারাজীবন সংরক্ষণ করা হবে। কোনো শিক্ষার্থী ৫০ বছর পরেও যদি তার আইডি দিয়ে এই ওয়েবসাইটে ঢোকেন তাহলে তার স্কুলজীবনের যাবতীয় তথ্য তিনি তখনও দেখতে পারবেন।’
গারা দেশের স্কুলগুলো যখন ধীরে ধীরে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করছে, তখন সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে বাদশাহ ফয়সাল ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ এই স্কুলকে প্রায় শতভাগ ডিজিটাল করে ফেলেছেন। এর ফলাফলও পেয়েছেন তারা। গত পাঁচ বছর ধরেই পিইসি, জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষায় এই স্কুলে পাশের হার শতভাগ। যা যশোর শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সেরা। যদিও স্কুলটিতে শিক্ষার্থী বাছাই করে ভর্তি করা হয় না। গড়ে সব ধরনের শিক্ষার্থীই ভর্তি করা হয়। একটানা গত কয়েক বছর ধরে এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করায় এখন এখানে ছেলে-মেয়েদের ভর্তি করার জন্য অনেক অভিভাবক আগ্রহী হচ্ছেন। এ অবস্থায় আগামী দিনে যদি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, তাহলে এ স্কুলের গড় ফল আরো ভালো করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন কর্তৃপক্ষ।
স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি আলহাজ মিজানুর রহমান খান বলেন, ‘চীন, জাপানসহ ইউরোপের দেশগুলোতে যেভাবে স্কুল পরিচালনা করা হয়, সেগুলো আমি খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। যশোর উপশহর বাদশাহ ফয়সাল ইসলামি ইনস্টিটিউটকে আমরা সেভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। স্কুল পরিচালনায় ইতিমধ্যেই সর্বাধুনিক সব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। আগামী দিনেও এই ক্ষেত্রে যেসব নতুন নতুন প্রযুক্তি আসবে, সেগুলোও দ্রুতই এই স্কুলে সংযুক্ত করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে স্কুলটির শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। বিভিন্ন স্কুল থেকে আমাদের স্কুল পরিদর্শন করতে আসছেন অনেকে। যশোর শিক্ষাবোর্ড মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমাদের স্কুলের কার্যক্রম ভিজিট করে খুবই প্রশংসামূলক মন্তব্য করেছেন। অভিভাবকরাও আমাদের এসব কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।’ তবে এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে তিনি সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। তিনি মনে করেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারের এটুআই প্রজেক্ট যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মফস্বল শহরের এই স্কুলটিকে যদি সরকারের এটুআই প্রজেক্টের সঙ্গে লিঙ্ক করে দেয়া যায় তাহলে এই স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। ডিজিটাল শিক্ষক আর শিক্ষার্থীরা ছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্ভব নয়।
শুধু আধুনিক পদ্ধতিতে শিক্ষাদান ও ভালো ফলাফল অর্জনই নয়, খেলাধুলার ক্ষেত্রেও উপশহর বাদশাহ ফয়সাল ইসলামি ইনস্টিটিউটের গড়েছে অনন্য রেকর্ড। বিশেষ করে স্কুল ক্রিকেটে যশোরে গত ১৫ বছর ধরে একটানা চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া খুলনা-বরিশাল বিভাগে স্কুলটি চ্যাম্পিয়ন হয়েছে পাঁচ বার। আর জাতীয় পর্যায়ে রানার্সআপ হয়েছে দুবার। স্কুল ক্যাম্পাসে বিশাল খেলার মাঠ খেলোয়াড় তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে শিক্ষার্থীরা মনে করে। এছাড়া প্রতিদিন সকালে ছাত্র-শিক্ষক সমাবেশ, জাতীয় সংগীত পরিবেশনসহ বিভিন্ন ক্রীড়া-শৈলী প্রদর্শনের মাধ্যমে এ স্কুলের শিক্ষার্থীদের মন ও মননশীলতা গড়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন শিক্ষক ও শিক্ষিকা এবং ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here